চেনা নির্বাচনি দৃশ্য এবার যেন বদলে গেছে সিলেটে। নেই রঙিন পোস্টারের ছড়াছড়ি, নেই বড় মিছিল কিংবা ভুরিভোজের আয়োজন। তবুও ভোটের উত্তাপ কমেনি একচুলও। বরং শান্ত পরিবেশ, প্রার্থীদের সংযত আচরণ এবং ভোট দিতে গ্রামে ফেরার প্রস্তুতিতে সিলেটের নির্বাচন ইতোমধ্যে দৃষ্টান্তমূলক হিসেবে আলোচিত হচ্ছে।
শহর থেকে গ্রাম—দিন-রাত গণসংযোগ, পথসভা ও স্লোগানে মুখর থাকলেও চোখে পড়ছে না অতীতের মতো উচ্ছৃঙ্খল প্রচার। নতুন আচরণবিধির কারণে প্রচারের ধরন পাল্টালেও ভোটারদের আগ্রহে ভাটা পড়েনি। বরং দীর্ঘদিন পর ভোটাধিকার ফিরে পাওয়ায় মানুষের মধ্যে বাড়তি আগ্রহ ও উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
ছয়টি সংসদীয় আসন নিয়ে গঠিত সিলেট জেলায় প্রচারের বড় একটি সময় পার হলেও এখন পর্যন্ত কোনো সহিংসতা বা বড় ধরনের সংঘাতের খবর নেই। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সব দল ও প্রার্থীরা নির্বিঘ্নেই তাদের প্রচার কার্যক্রম চালাচ্ছেন।
জেলার রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম বলেন, গত দুই সপ্তাহে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। কোনো প্রার্থীও বাধা বা হয়রানির লিখিত অভিযোগ দেননি। প্রার্থীদের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রয়েছে। প্রশাসন নিরপেক্ষভাবে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছে বলেও জানান তিনি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও আশাবাদী পুলিশ প্রশাসন। সিলেট মহানগর পুলিশের কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ পিপিএম জানান, সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে বাড়তি নজরদারি চলছে। পুলিশের পাশাপাশি বিজিবিও দায়িত্ব পালন করবে।
শিক্ষাঙ্গনের প্রতিনিধিরাও ইতিবাচক পরিবেশের কথা বলছেন। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. সরওয়ার উদ্দিন চৌধুরীর মতে, এবারের পরিবেশ ভোটারদের কেন্দ্রমুখী করবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সিলেটে ভোটার উপস্থিতি হবে চোখে পড়ার মতো।
সিলেট জেলার ছয় আসনে মোট ভোটার ২৯ লাখের বেশি। বিভিন্ন বয়স ও শ্রেণিপেশার মানুষ ভোটের দিন কেন্দ্রে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অনেক শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও প্রবাসী পরিবারের সদস্যরা ভোট দিতে নিজ নিজ গ্রামে ফেরার পরিকল্পনা করছেন।
তবে পোস্টার আর আপ্যায়ন না থাকায় কেউ কেউ নির্বাচনের পুরনো উৎসবের আমেজ খুঁজে পাচ্ছেন না। শহরতলির এক ভোটার মজা করে বলেন, ‘এবার ভোটটা খুব শুকনো লাগছে—পোস্টারও নাই, খাওয়াদাওয়াও নাই!’ একই সুর শোনা গেছে কিছু কর্মী-সমর্থকের কথায়ও। তাদের মতে, আগের মতো জমজমাট আড্ডা আর উৎসবের রঙ কমে গেছে।
রাজনৈতিক সমীকরণেও রয়েছে বাড়তি কৌতূহল। সিলেটের ছয়টি আসনে বিএনপি ও জামায়াতসহ বিভিন্ন দলের মোট ৩৩ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। আসন ভাগাভাগি ও জোট সমীকরণ ঘিরে স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা—এবার ফলাফল হতে পারে হাড্ডাহাড্ডি।
ভোটের মাঠে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপির ধানের শীষ ও জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লার মধ্যে। কিছু আসনে স্বতন্ত্র ও বিদ্রোহী প্রার্থীর উপস্থিতি লড়াইকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
সব মিলিয়ে, শান্তিপূর্ণ প্রচার, প্রশাসনের কঠোর নজরদারি এবং ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ—এই তিনের সমন্বয়ে সিলেটের নির্বাচন একটি ভিন্ন মাত্রা পাচ্ছে। অনেকের মতে, যদি এ ধারা বজায় থাকে, তাহলে সিলেটই হতে পারে দেশের জন্য একটি আদর্শ নির্বাচনি উদাহরণ।

নিজস্ব প্রতিবেদক 


















