ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের নির্বাচনি প্রচারণার সময়সীমা সারা দেশের ন্যায় সিলেটে ও শেষ হয়েছে । নির্বাচন কমিশনের বিধান অনুযায়ী ভোট গ্রহণের ৪৮ ঘণ্টা আগে সব ধরনের প্রচারণা বন্ধ করতে হয়। সেই অনুযায়ী মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৭টা থেকে কোনও প্রার্থী নির্বাচনি প্রচারণা করতে পারবেন না।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সারাদেশে অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সে ব্যালট পেপারের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ চলবে।
সিলেট জেলার ৬টি আসনে শেষমুহূর্তে এসে প্রার্থীরা অন্তর্মুখী প্রচারণার দিকে বেশি মনযোগ দিচ্ছেন। ইতিমধ্যে আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রচার প্রচারণা শেষে হলেও এখন থেকে ব্যক্তিগতভাবে ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করবেন প্রার্থী ও সমর্থকরা।
মাঠের হিসেবে ৬টি আসনের মধ্যে ভোটারদের দৃষ্টিতে তিনটিতে এগিয়ে আছে জামায়াত জোটের প্রার্থীরা। ধানের শীষের প্রার্থীরা প্রার্থীরা দুইটিতে এবং একটি আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস মিলেছে। শেষমুহূর্তে এসে ভোটাররা দলীয় ইমেজ ও প্রার্থীর ব্যক্তিগত ইমেজের প্রতি বেশি খেয়াল রাখছেন।
সিলেট-১ : জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-১ আসনে যে দলের প্রার্থী জয়লাভ করে সে দলই সরকার গঠন করে-এমন একটি কথা প্রচলিত। স্বাধীনতার পর থেকে অনুষ্ঠিত প্রতিটি নির্বাচনে সত্যও হয়েছে এটি। সেই সূত্র ধরে ঐতিহ্যবাহী আসনে পরিণত হওয়া এই আসনে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জয়ী হতে মরিয়া বিএনপি ও জামায়াত।
সিলেট সিটি ও সদর নিয়ে গঠিত এ আসনে ধানের শীষ নিয়ে বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা খন্দকার আব্দুল মুক্তাদীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এছাড়াও জামায়াতে ইসলামীর প্রতীক দাঁড়িপাল্লা নিয়ে এগারো দলীয় জোটের প্রার্থী জেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা হাবিবুর রহমান, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন কাস্তে, বাসদের প্রণব জ্যোতি পাল মই, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের শামীম মিয়া আপেল, গণঅধিকার পরিষদের আকমল হোসেন ট্রাক, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাহমুদুল হাসান হাতপাখা এবং বাসদ (মার্কসবাদী) সঞ্জয় কান্তি দাস কাঁচি প্রতীক নিয়ে এই আসনে নির্বাচন করছেন।
তবে ভোটার ও জনতার আকর্ষণ মূলত বিএনপি ও জামায়াত জোটের প্রার্থীদের দিকে। আসনটিতে এবার ভিন্ন মেজাজে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হয়েছেন বিএনপি, জামায়াতসহ অন্য দলের প্রার্থীরা। প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আসনটিতে জয়লাভ করতে নানা কৌশল অবলম্বন করছে প্রধান দুই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি ও জামায়াত। তাদের জয়-পরাজয় দলের আত্মমর্যাদার বিষয় বলে বিবেচনা করছেন তারা।
মর্যাদাপূর্ণ এই এই আসনে এখন পর্যন্ত বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে বিএনপি। অন্যদিকে অতিতে দলের বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকান্ডে অনেকটা পিছিয়ে আছেন দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী মাওলানা হাবিবুর রহমান।
সিলেট-২ : বিশ্বনাথ ও ওসমানীনগর নিয়ে গঠিত এ আসন নিখোঁজ বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর ঘাঁটি হিসেবে তার প্রতি মানুষের আলাদা দুর্বলতা আছে। এই আসনে ধানের শীষের প্রার্থী দেওয়া হয়েছে ইলিয়াস পত্নী তাহসিনা রুশদী লুনা। ইলিয়াস আলীর প্রতি মানুষের আলাদা দুর্বলতা রয়েছে, তাই তিনি এখন পর্যন্ত বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন। এখন ধানের শীষের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে জামায়াত জোটের প্রার্থী দেওয়াল ঘড়ি মার্কায় খেলাফত মজলিসের মোহাম্মদ মুনতাসির আলীর মধ্যে।
বিএনপি জামায়াত জোট ছাড়াও এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন গণফোরামের মুজিবুল হক উদীয়মান সূর্য, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির উদ্দিন হাতপাখা এবং লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে জাতীয় পার্টির মাহবুবুর রহমান চৌধুরী।
সিলেট-৩ : দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জ নিয়ে গঠিত এই আসনে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের মনোনয়ন নিয়ে মাঠে রয়েছেন বর্ষিয়ান আলেমে দ্বীন মরহুম নুরুদ্দিন আহমদ গহরপুরী র. এর ছেলে খেলাফত মজলিসে রিক্সা প্রতিকের প্রার্থী মাওলানা মুসলেহ উদ্দিন রাজু। এই আসনে বিএনপির ধানের শীষের প্রার্থী প্রবাসী বিএনপি নেতা আব্দুল মালিক। লোকমান আহমদ সরে যাওয়ায় কোনঠাসা আব্দুল মালিকের পালে লাগে উত্তরীও হাওয়া। তবে শেষদিকে এসে জামায়াত নেতা লোকমানসহ জোটের কর্মী সমর্থকরা রিকশা মার্কার ব্যাপক প্রচারণায় নামায় ভোটের সুর ঘুরতে শুরু করে। শেষমুর্হূতে এসে ধানের শীষের প্রার্থী আব্দুল মালিক কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থায় থাকলেও মাওলানা রাজুর দিকে ভোটারের পাল্লা ক্রমশ ভারী হচ্ছে। এতে ভোটে এখানে লড়াইয়ের ইংগিত দেখছেন ভোটাররা।
এই আসনে অন্যান্য প্রার্থীর মধ্যে আছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আনওয়ারুল হক হাতপাখা, জাতীয় পার্টির আতিকুর রহমান লাঙ্গল, স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার মোস্তাকিম রাজা চৌধুরী ফুটবল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মাইনুল বাকর কম্পিউটার।
সিলেট-৪ : সীমান্ত জনপদ জৈন্তা, গোয়াইনঘাট ও কোম্পানীগঞ্জ নিয়ে গঠিত এই আসনে ভোটের লড়াইয়ে অনেকটাই এগিয়ে রয়েছেন বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী সিলেট সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র ‘ম্যাজিকম্যান’ খ্যাত আরিফুল হক চৌধুরী। তার সাথে মুল প্রতিদ্বন্ধিতা হবে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীনের।
এখানে জাতীয় পার্টির মুজিবুর রহমান লাঙ্গল, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাওলানা সাঈদ আহমদ হাতপাখা এবং গণঅধিকার পরিষদের জহিরুল ইসলাম ট্রাক প্রতীক নিয়ে লড়লেও তাদের প্রতি তেমন সাড়া দেখা যায়নি ভোটারদের মধ্যে। শুধু কোম্পানীগঞ্জে প্রত্যান্ত কিছু জনপদে হাতপাখার নিজস্ব কিছু ভোটার আছে বলে জানান স্থানীয়রা।
স্থানীয় প্রার্থীতা ইস্যু নিয়ে কথা তুললেও এখন পর্যন্ত ভোটের মাঠে সুবিধা করতে পারছেন না জামায়াতের প্রার্থী জয়নাল আবেদিন।তবে ঐক্যবদ্ধ বিএনপি এবং সিসিকে উন্নয়ন কাজের ফিরিস্তির কারনে বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন আরিফুল হক চৌধুরী। এর বাইরে কওমী ঘরনা বেশ ভোট আরিফ তার দিকে টানতে পেরেছেন। তাই শেষ দিকে এসে স্থানীয় ছেলে নাকি বিএনপি প্রার্থী আরিফকে ভোটাররা বেছে নেন তা এখন দেখার বিষয়।
সিলেট-৫ : আলেম-উলামা আধ্যুসিত এই আসনে বিএনপি জোটের মনোনয়ন দেয়া হয়েছে জমিয়তের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা ওবায়দুল্লাহ ফারুককে। তিনি খেজুর গাছ প্রতিক নিয়ে নির্বাচনে লড়ছেন। জামায়াতের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসনে এগারো দলীয় জোট থেকে মনোনয় দেওয়া হয়েছে জনপ্রিয় ইসলামী বক্তা মুফতি মাওলানা আবুল হাসান ও সদস্য বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থী মামুনুর রশীদ (চাকসু মামুন) ফুটবল প্রতিক নিয়ে তার সাথে প্রতিদ্বন্ধিতা করছেন। গাছে সমর্থন দেওয়ায় এখানে ধানে শীষের কোনো প্রার্থী নেই। ফলে ধানের শীষ সমর্থকদের ভোট কোন দিকে যাবে তার উপর নির্ভর করে মামুন না ফারুক কে বিজয়ী হবেন। তবে একটি নির্দিষ্ট গোষ্টির ভোটব্যাংক নিয়ে ভোটের মাঠে বেশ শক্ত অবস্থানও রয়েছে মুফতি আবুল হাসানের।
এছাড়া বাংলাদেশ মুসলিম লীগের বিলাল হোসেন হারিকেন প্রতীক নিয়ে লড়ছেন এখানে।
সিলেট-৬ : সিলেটের সবচেয়ে ভিআইপি আসনের মধ্যে একটি গোলাপগঞ্জ বিয়ানীবাজারের এই আসন। এখানে বিএনপি থেকে ধানের শীষ প্রতিক নিয়ে ভোটে লড়ছেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও আন্দোলন সংগ্রামে পরিক্ষিত মুখ এডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী। তার সাথে মুল প্রতিদ্বন্ধিতায় রয়েছেন জামায়াত জোট থেকে দাঁড়িপাল্লা নিয়ে লড়ছেন জামায়াতের ঢাকা মহানগরীর আমীর মু. সেলিম উদ্দিন।
গোলাপগঞ্জ ও বিয়ানীবাজার উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসটিতে বিগত দেড়যুগ থেকে গোলাপগঞ্জবাসী কোন এমপি পাননি। একারনে এই উপজেলার মানুষ নিজেদের এলাকায় এমপি নিয়ে আসতে ঐক্যবদ্ধ। আর ভোটারের হিসেবেও বিয়ানীবাজার উপজেলার চেয়ে গোলাপগঞ্জে ভোটার সংখ্যা বেশী এবং বিএনপি প্রার্থী এমরান চৌধুরীর বাড়িও গোলাপগঞ্জে। তাই এই দিক থেকে বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন ধানের শীষের প্রার্থী।
এই আসনে অন্যান্যের মধ্যে গণঅধিকার পরিষদের জাহিদুর রহমান (ট্রাক) এবং জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ আব্দুন নূর লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ(এসএমপি)-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নির্বাচন উপলক্ষে আজ মঙ্গলবার বিকেল ৩টায় সিলেট জেলা স্টেডিয়াম থেকে যৌথবাহিনীর টহল ও মহড়া অনুষ্ঠিত হবে। এতে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ, র্যাব, বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী,নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটগণ অংশগ্রহণ করবেন।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য মতে, সিলেট জেলায় মোট ভোটার ৩১ লাখ ১৩ হাজার ৩৯৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১৬ লাখ ২৪ হাজার ৯৭০ জন, মহিলা ১৪ লাখ ৮৮ হাজার ৪০৮ জন এবং হিজড়া ভোটার রয়েছেন ১৮ জন। অন্যদিকে সিলেট জেলায় যে ৬টি নির্বাচনী আসন রয়েছে এর মধ্যে সিটি কর্পোরেশন ও সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত সিলেট-১ আসন নগর পুলিশের ছয়টি থানায় পড়েছে। আর সিলেট-৩ আসনে তিনটি উপজেলার মধ্যে দক্ষিণ সুরমা উপজেলার বিভিন্ন ভোট কেন্দ্র নগর পুলিশের দুটি থানায় আওতায় রয়েছে। এছাড়াও সিলেট-২, ৪, ৫, ৬ ও ৩ আসনের দুটি উপজেলাসহ বাকি ভোট কেন্দ্রগুলো জেলা পুলিশের অধীনে।
অন্যদিকে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রের বরাত দিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়, মহানগরীর ‘অধিক গুরুত্বপূর্ণ’ কেন্দ্রগুলোতে চারজন করে অস্ত্রসহ পুলিশ, দুইজন অস্ত্রধারী আনসার, প্রতি কেন্দ্রে লাঠিসহ ১০ জন পুলিশ ও মহিলা আনসার মোতায়েন থাকবে। এছাড়া ‘গুরুত্বপূর্ণ’ ও ‘সাধারণ’ কেন্দ্রগুলোতে থাকবে তিনজন করে অস্ত্রধারী পুলিশ, দুইজন অস্ত্রধারী আনসার, প্রতি কেন্দ্রে লাঠিসহ ১০ জন পুলিশ ও মহিলা আনসার মোতায়েন থাকবে।’
সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, মহানগর পুলিশের আওতায় মোট ২৯৪টি ভোট কেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে অধিক গুরুত্বপূর্ণ ৯৫, গুরুত্বপূর্ণ ১৩৪ ও সাধারণ ৬৫টি কেন্দ্র রয়েছে। তিনি বলেন, ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তার জন্য ইতিমধ্যে ২৩৪টি বডি-ওর্ন ক্যামেরা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। একই সাথে মহানগরী এলাকায় ২ হাজার ২শ’ পুলিশ সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবেন। একই সাথে ভোটকেন্দ্রগুলোতে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, মোবাইল টিম ও স্ট্রাইকিং ফোর্স মোতায়েন থাকবে।

নিজস্ব প্রতিবেদক 


















