রমজান এলেই সিলেটে আবারও সামনে আসে বহু পুরনো এক রেওয়াজ মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে ইফতার পাঠানো, যা স্থানীয় ভাষায় পরিচিত ‘ফুড়ির বাড়ি ইফতারি’ নামে। শত বছরের ঐতিহ্য বহন করা এ প্রথা আজও টিকে আছে স্বমহিমায়। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর রূপ ও অর্থ নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক এটি কি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ, নাকি সামাজিক চাপ ও জুলুম?
প্রবীণদের মতে, রমজান মাসে জামাই বাড়িতে ইফতার পাঠানো সিলেটের চিরায়ত সংস্কৃতির অংশ। নতুন জামাই হলে প্রথম রোজায় পিঠা-পায়েস, ফলমূল ও ঘরে তৈরি নানা আইটেম নিয়ে যাওয়া হয়। দ্বিতীয় দফায় বড় পরিসরে মিষ্টান্ন, পোলাও, চপ-বেগুনি ও ফলমূল সাজিয়ে খাঞ্চা পাঠানো হয়। শেষ রমজানে ঈদের কাপড়সহ হালকা ইফতার নিয়ে আত্মীয়তার সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার রেওয়াজ রয়েছে।
কিন্তু বাস্তবতা বলছে, অনেক ক্ষেত্রে এ প্রথা আর স্বতঃস্ফূর্ত নেই। সামাজিক মর্যাদা রক্ষার নামে অনেক মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের পরিবারকে ধার-দেনা করে ইফতার পাঠাতে হয়। কেউ গরু-ছাগল বিক্রি করেন, কেউ সুদে টাকা আনেন শুধু ‘সম্মান রক্ষা’র জন্য। স্থানীয় কয়েকজনের ভাষ্য, ইফতার না পাঠালে বা আয়োজন ছোট হলে মেয়েকে শ্বশুরবাড়িতে কটূক্তি শুনতে হয় এমন অভিযোগও রয়েছে।
তরুণ প্রজন্মের একাংশ এ প্রথাকে যেওতুক সংস্কৃতির সম্প্রসারিত রূপ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, সংযমের মাসে প্রদর্শনীর প্রতিযোগিতা রমজানের চেতনার পরিপন্থী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ‘ফুড়ির বাড়ি ইফতারি’ নিয়ে সমালোচনা বাড়ছে।
অন্যদিকে সমাজের প্রবীণ ও কিছু সামাজিক ব্যক্তিত্ব বলছেন, এটি মূলত ছিল বিত্তশালী বাবার মেয়ের প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ। তবে এখন এটি বাধ্যবাধকতায় রূপ নিয়েছে। তাদের মতে, ইফতার দেওয়া বা না দেওয়া সম্পূর্ণভাবে পরিবারের সামর্থ্য ও ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও প্রশ্ন উঠেছে। কয়েকজন আলেমের মতে, ইসলামে এমন কোনো বাধ্যতামূলক বিধান নেই। সংযমের মাসে কারও ওপর ইফতারের আয়োজন চাপিয়ে দেওয়া অনুচিত।
সব মিলিয়ে, ‘ফুড়ির বাড়ি ইফতারি’ এখন সিলেট সমাজে দ্বৈত চিত্রের প্রতীক একদিকে ঐতিহ্যের আবেগ, অন্যদিকে সামাজিক চাপের বাস্তবতা। প্রশ্ন রয়ে যায়, এ প্রথা কি মানবিক রূপে টিকে থাকবে, নাকি সময়ের সঙ্গে বদলে যাবে?

জুনেদ আহমদ 


















