চায়ের দেশ মৌলভীবাজারে জয় পরাজয়ের বড় নিয়ামক শক্তি চা শ্রমিকদের ভোট। প্রায় পৌনে তিন লাখ চা শ্রমিক ভোটারের ভোট যে প্রার্থীর ব্যালটে পড়ে, সেই প্রার্থীর জয়ের পাল্লা তত ভারী। ভোট ঘনিয়ে আসায় চায়ের কাপে উত্তাপ বাড়ছে। দীর্ঘ ১৭ বছর পর ভোটের অধিকার ফিরে পাওয়ায় এবারের ভোটে ফিরেছে বাড়তি উৎসাহ ও উদ্দীপনা। জেলাবাসী ভোট দিতে অপেক্ষা করছে ভোটের দিনের।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জেলার দুটি আসনে ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার প্রার্থীর হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। অপর দু’টি আসনে ধানের শীষের প্রতিদ্বন্দ্বী ১১ দলীয় জোটের এনসিপির শাপলা কলি ও খেলাফত মজলিসের দেওয়াল ঘড়ি। যদিও একটি আসনে শেষ মুহূর্তে দাঁড়িপাল্লার প্রার্থীও মাঠে নেমেছেন। ফলে জেলার তিনটি আসনেই ধানের শীষের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী দাঁড়িপাল্লা। আর একটি আসনে বিএনপি ও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর মধ্যে মূল ভোটের লড়াই হবে, এমনটাই বলছেন স্থানীয়রা।
ইসির তথ্য বলছে, ৭ উপজেলা, ৬ পৌরসভা ও ৬৭ ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত মৌলভীবাজার জেলায় চারটি আসনে মোট ২৩ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। মৌলভীবাজার জেলায় সিলেট বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে কম ভোটার রয়েছেন। এবার এই জেলায় মোট ভোটার ১৭ লাখ ৭২ হাজার ৬৮৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার রয়েছেন ৯ লাখ ১৯ হাজার ৮১৩ জন ও মহিলা ভোটার ৮ লাখ ৫২ হাজার ৮৬৭ জন। এই জেলায় হিজড়া ভোটার সংখ্যা ৮ জন। মৌলভীবাজার-১ (জুড়ি-বড়লেখা) আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৩৭ হাজার ৮১৬ জন, মৌলভীবাজার-২ (কুলাউড়া) আসনে ৩ লাখ ৩ হাজার ২০ জন, মৌলভীবাজার-৩ (সদর-রাজনগর) আসনে ৪ লাখ ৮৬ হাজার ২০১২ জন ও মৌলভীবাজার-৪ (শ্রমিঙ্গল-কমলগঞ্জ) আসনে ভোটার রয়েছেন ৪ লাখ ৮৭ হাজার ৮৯২ জন। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মৌলভীবাজারে ভোটার ছিলেন ১৫ লাখ ১৬ হাজার ৫৮৮ জন ভোটার রয়েছেন। সেই হিসেবে এবার এ জেলায় ভোটার সংখ্যা বেড়েছে ২ লাখ ৫৬ হাজার ১০০ জন।
তথ্য বলছে, সিলেট বিভাগের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে নিবন্ধন করেছেন মৌলভীবাজার জেলার প্রবাসী ও সরকারি চাকরিজীবিরা। এ জেলায় মোট নিবন্ধন করেছেন ২৩ হাজার ৭৯৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২০ হাজার ১৮৮ জন ও মহিলা তিন হাজার ৬১০ জন।
তথ্য মতে, মৌলভীবাজার-১ (বড়লেখা-জুড়ি) আসনে মোট ৬ জন প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্ধন্দ্বিতা করছেন। বিএনপির নাসির উদ্দিন আহমেদ ধানের শীষ, জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় জোটের মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম দাঁড়িপাল্লা, জাতীয় পার্টির আহমেদ রিয়াজ উদ্দিন লাঙল, গণঅধিকার পরিষদের মো. আব্দুন নুর ট্রাক, গণফ্রন্টের মো. শরিফুল ইসলাম মাছ ও স্বতন্ত্র প্রার্থী বেলাল আহমদ কাপ-পিরিচে নির্বাচন করছেন।
তবে এই আসনে মূল লড়াই হবে বিএনপির নাসির উদ্দিন আহমেদ ও জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলামের মধ্যে। নাসির উদ্দিন আহমেদ জুড়ি উপজেলার বাসিন্দা হওয়ায় এখানে তার প্রভাব প্রতিপত্তি বেশি। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম বড়লেখা উপজেলার বাসিন্দা হওয়ায় সেখানে ভোটের মাঠে বেশ শক্ত অবস্থানে তিনি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দুই প্রার্থীই গণসংযোগে ব্যস্ত সময় পার করছেন। চষে বেড়াচ্ছেন বিভিন্ন গ্রাম ও চা বাগানে। সেখানে বিএনপি প্রার্থী তুলে ধরছেন তারেক রহমানের ৩১ দফা, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষি কার্ডের সুবিধা। আর জামায়াত প্রার্থী ন্যায় ইনসাফ ও সাম্যের বাংলাদেশ গঠনে জামায়াত তথা ১১ দলীয় জোটের পরিকল্পনা ভোটারদের কাছে তুলে ধরছেন। নির্বাচিত হলে বড়লেখা ও জুড়িতে উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি পরিকল্পনা তুলে ধরছেন।
সেখানকার স্থানীয় ভোটাররা বলছেন, এই আসনে বিএনপি ও জামায়াত জোটের প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। যিনিই নির্বাচিত হবেন খুব অল্প ভোটের ব্যবধানে জিতবেন। কারণ সেখানে জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক অবস্থান পুরো জেলার মধ্যে সবেচেয় শক্তিশালী।
এদিকে মৌলভীবাজার-২ (কুলাউড়া) আসনটি নানা কারণে বেশ আলোচিত। সবসময় এই আসনে শ্রোতের বিপরীতে এমপি নির্বাচিত করেছে সেখানকার জনগণ। ফলে উন্নয়নে বেশ পিছিয়ে রয়েছে এই উপজেলা। ১৩টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এই আসনে ভোটের সমীকরণ এবার বেশ জটিল। এই আসনটিতে ৮জন প্রার্থী সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্ধন্দ্বিতা করছেন। প্রার্থীরা হলেন বিএনপির মো. শওকতুল ইসলাম ধানের শীষ, জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী মো. সায়েদ আলী দাঁড়িপাল্লা, স্বতন্ত্র প্রার্থী নওয়াব আলী আব্বাছ খান ফুটবল, জাতীয় পার্টির মো. আব্দুল মালিক লাঙল, স্বতন্ত্র প্রার্থী ফজলুল হক খান কাপ-পিরিচ, স্বতন্ত্র প্রার্থী এম জিমিউর রহমান ঘোড়া, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আব্দুল কুদ্দুস হাতপাখা এবং বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের সাদিয়া নোশিন তাসনিম চৌধুরী কাঁচি প্রতীকে নির্বাচন করছেন। এই আসনে একক ভাবে কেউই শক্তিশালী না হলেও ত্রিমুখী লড়াইয়ের আভাস দিচ্ছেন ভোটাররা। মূলত বিএনপির মো. শওকতুল ইসলাম, জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার মো. সায়েদ আলী ও স্বতন্ত্র প্রার্থী নওয়াব আলী আব্বাছ খানের মধ্যে ভোটের লড়াই হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার মো. সায়েদ আলী নির্বাচনের মাঠে প্রথম হলেও অল্প দিনেও বেশ শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছেন। তিনি বিরামহীনভাবে গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। বিভিন্ন বাড়িতে উঠান বৈঠকের পাশাপাশি একাধিক পথসভাও করছেন। তুলে ধরছেন উন্নয়ন পরিকল্পনা। নির্বাচিত হলে পিছিয়ে পড়া কুলাউড়াকে এগিয়ে নিতে একগুচ্ছ পরিকল্পনা তুলে ধরছেন। ইনসাফ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে সামিল ও চাঁদাবাজমুক্ত উপজেলা গঠনে ভোটারদের সমর্থন চেয়েছেন তিনি। বিএনপির মো. শওকতুল ইসলাম ইতোপূর্বে ২০০১ সালে লাঙ্গল প্রতীকে নির্বাচন করে হেরেছেন। পরবর্তীতে বিএনপিতে যোগ দিলেও ধানের শীষে মনোনয়ন পেয়েছেন এবারই প্রথম। ফলে নির্বাচনের মাঠে পুরাতন হলেও শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাকে।
অপরদিকে এই আসনের দুই বারের সাবেক এমপি নওয়াব আলী আব্বাছ খান এবার ফুটবল প্রতীকে নির্বাচন করছেন। ১৯৯১ ও ২০০৮ সালে তিনি জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীকে এমপি নির্বাচিত হন। এবার দলীয়ভাবে না হলেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে ভোটের মাঠে বেশ সক্রিয় পৃথিমপাশার ঐতিহাসিক জমিদার বাড়ির এই সন্তান। পারিবারিক ঐতিহ্যের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা অবস্থান রয়েছে এই প্রার্থীর। এছাড়া বাকি প্রার্থীরাও মাঠে বেশ সক্রিয় রয়েছেন এবং প্রচার প্রচারণায় উত্তাপ ছড়াচ্ছেন নির্বাচনি মাঠে।
মৌলভীবাজার-৩ (সদর-রাজনগর) আসনটি সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের স্মৃতি বিজড়িত আসন। এই আসনে এবারের নির্বাচনে ৪ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বিএনপির ধানের শীষ পেয়েছেন সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের জেষ্ঠ্য ছেলে একই আসনের সাবেক এমপি এম নাসের রহমান। এই আসনে ধানের শীষের মূল প্রতিদ্বন্দ্বি ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী খেলাফত মজলিসের আহমদ বিলালের দেয়াল ঘড়ি। তবে মনোনয়ন প্রত্যাহার না করায় শেষ মুহুর্তে এই আসনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে মাঠে নেমেছেন জামায়াতে ইসলামীর মো. আব্দুল মান্নান। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির জহর লাল দত্ত কাস্তে প্রতীক নিয়ে মাঠে রয়েছেন। তবে এই আসনে সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের জেষ্ঠ্য ছেলে এম নাসের রহমান নানা কারণে এগিয়ে রয়েছেন। এখানে ধানের শীষের সহজ জয় আশা করছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা।
মৌলভীবাজার-৪ (শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ) আসনে সবচেয়ে বেশি চা শ্রমিক ভোটার রয়েছেন। এই আসনে ৭জন এমপি পদপ্রার্থী মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। এখানে বিএনপির ধানের শীষের প্রার্থী হয়েছেন মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী ওরফে হাজী মুজিব। তিনি ধানের শীষে একাধিকবার নির্বাচন করলেও প্রতিবারই হেরেছেন। বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী শ্রীমঙ্গল পৌরসভার সাবেক মেয়র মো. মহসিন মিয়া মধু ফুটবল মার্কায় নির্বাচন করছেন। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও ১০ দলীয় জোটের প্রার্থী শেখ নুরে আলম হামিদী (রিকশা), জাতীয় নাগরিক পার্টি ও ১০ দলীয় জোটের প্রার্থী দাবিদার প্রীতম দাস (শাপলা কলি), জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ জরিফ হোসেন (লাঙল) ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) মো. আবুল হাসান (মই) মার্কা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে লড়ছেন। ভোটাররা বলছেন, এই আসনে ধানের শীষের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. মহসিন মিয়া। এই দুই জনের মধ্যে ভোটের লড়াই হবে বলে মনে করছেন সেখানকার ভোটাররা।
জানা গেছে, চা বাগান অধ্যুষিত জেলা মৌলভীবাজারের চার আসনেই জয় পরাজয়ে বড় নিয়ামক শক্তি ৯২টি চা বাগানের ২ লাখ ৭০ হাজার চা শ্রমিক ভোটার। বড় একটি অংশ চা শ্রমিক হওয়ায় ভোট এলেই বাড়ে চা শ্রমিকদের কদর। সাধারণত ভোটও সবচেয়ে বেশি পড়ে তাঁদের। এ ছাড়া রয়েছেন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নতুন ভোটার। তাই বিশেষ করে চা-বাগান এলাকা এবং নতুন ভোটারদের প্রতি বাড়তি নজর দিচ্ছেন প্রার্থীরা। কেননা অনেক ক্ষেত্রে ভোটের ফল নির্ধারণে তাঁদের নির্ণায়ক হিসেবে দেখা হয়। এবার চা শ্রমিকদের পাশাপাশি জয় পরাজয়ে আরেক নিয়ামক শক্তি হয়ে উঠেছেন প্রবাসী ভোটাররাও। এবারই প্রথম প্রবাসীরা পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করছেন। ফলে চা শ্রমিকদের পাশাপাশি চার আসনে প্রবাসীদের প্রায় ২৪ হাজার ভোটে চোখ প্রার্থীদের।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে। ভোটের আর বাকি মাত্র ৬ দিন। ভোট ঘনিয়ে আসায় প্রচারণা-গণসংযোগে সরগরম হয়ে উঠেছে সর্বাধিক চা বাগান অধ্যুষিত এই আসন। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে রাজনৈতিক উত্তাপ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাত্রা। ভোটাররা বলছেন, নির্বাচনে মার্কা নয়, প্রার্থীর যোগ্যতাকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন।
সব মিলিয়ে মৌলভীবাজারের চারটি আসনেই ভোটারদের আগ্রহ লক্ষণীয়। কোথাও ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকায় জেলার নির্বাচনী উত্তাপ এখন তুঙ্গে। শেষ পর্যন্ত কার ভাগ্যে জয় আসে, তা জানতে অপেক্ষা এখন ভোটের দিনের।

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি 

















