আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সিলেট-৩ আসনে নির্বাচনী হাওয়া বইতে শুরু করেছে। নগর থেকে গ্রাম পর্যন্ত এখন সরগরম রাজনীতি। মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপে জমে উঠেছে নির্বাচনী মাঠ। প্রার্থীরা মানুষের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন, দিচ্ছেন উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি। কেউ সামাজিক অনুষ্ঠানে, কেউবা ধর্মীয় মাহফিলে অংশ নিয়ে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছেন প্রতিনিয়ত।
দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জ—বিএনপির শক্ত ঘাঁটি এখন বিভক্ত
সিলেট শহরঘেঁষা দক্ষিণ সুরমা, দেশের অন্যতম শিল্পাঞ্চল ফেঞ্চুগঞ্জ এবং প্রবাসী অধ্যুষিত শীতলপাটি খ্যাত বালাগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত সিলেট-৩ আসন। এই আসনে বিএনপি বরাবরই শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী দল হিসেবে পরিচিত। তবে এবারের নির্বাচনে দলটির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও মনোনয়ন সংকটে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। সর্বশেষ বিএনপির প্রাথমিক তালিকায় মনোনয়ন পেয়েছেন যুক্তরাজ্য বিএনপির সভাপতি ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এম এ মালিক। এই আসনে আরও মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ূম চৌধুরী এবং আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার এম এ সালাম। দুজনই দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় কাজ করছেন, স্থানীয়ভাবে তাদের সংগঠনিক ভিত্তিও বেশ শক্ত।
তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ এম এ মালিক, তবু জনবিচ্ছিন্নতার অভিযোগ
বিএনপির একাধিক সূত্র জানায়, যুক্তরাজ্যপ্রবাসী এম এ মালিক বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গত বছরের ৫ আগস্ট তিনি দেশে ফিরে স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হন। দীর্ঘ ১৯ বছর পর দেশে ফিরে গত ১৭ অক্টোবর নিজ বাড়ি দক্ষিণ সুরমার তেতলিতে অবস্থান করেন তিনি। এ সময় তিনি নির্বাচনী এলাকার তিন উপজেলায় একাধিক সভা-সমাবেশে অংশ নেন। কিছুদিন পর ফের যুক্তরাজ্যে ফিরে যান এবং পরে কয়েক দফায় দেশে ফিরে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যোগ দেন।তবে স্থানীয় বিএনপির অনেক নেতা মনে করছেন, এম এ মালিক দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থাকায় জনবিচ্ছিন্ন ও সংগঠন থেকে দূরে। ফলে তাঁর প্রার্থিতা নিয়ে দলীয় পর্যায়ে নীরব ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ প্রকাশ্যে না বললেও অভ্যন্তরীণ আলোচনায় তাঁর মনোনয়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।দলের উচ্চপর্যায়ের ঘনিষ্ঠতা থাকায় কেউ প্রকাশ্যে বিরোধিতা করছেন না, তবে প্রার্থী পুনর্বিবেচনার দাবিও দলীয় ফোরামে জোরেশোরে উঠছে।
বিএনপির বিভাজনে সুযোগ দেখছে জামায়াত
বিএনপির এই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে মাঠে নেমেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটি ইতোমধ্যেই দক্ষিণ সুরমা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মাওলানা লোকমান আহমদকে এ আসনে একক প্রার্থী ঘোষণা করেছে। মাওলানা লোকমান দীর্ঘদিন রাজনীতিতে সক্রিয়। তিনি দক্ষিণ সুরমা উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর রয়েছে পরিবহন সেক্টরে প্রভাব, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় ভূমিকা এবং নিজস্ব একটি বড় ভোটব্যাংক। রাজনৈতিক মহলের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দক্ষিণ সুরমা ও ফেঞ্চুগঞ্জে জামায়াতের তৃণমূলভিত্তি এখন আগের চেয়ে শক্তিশালী। ফলে বিএনপি যদি ঐক্যবদ্ধ না হতে পারে, তবে জামায়াতের প্রভাব এ আসনে বিএনপির জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ইসলামী দলগুলোর সক্রিয়তা বাড়ছে
এ আসনে শুধু জামায়াত নয়, অন্যান্য ইসলামী দলগুলোরও তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘু বিষয়ক সম্পাদক মাওলানা নজরুল ইসলাম, খেলাফত মজলিসের মাওলানা দিলওয়ার হোসাইন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মাওলানা লুৎফুর রহমান কাসেমী এবং ইসলামী আন্দোলনের মাওলানা রেজাউল হক চৌধুরী রাজু নিজ নিজ দলের প্রার্থী হিসেবে মাঠে কাজ করছেন। তারা প্রত্যেকেই স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী এবং নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান দৃঢ় করতে মাঠে সক্রিয় রয়েছেন।এছাড়া এ আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর কেন্দ্রীয় সদস্য নুরুল হুদা জুনেদ-এর নামও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছে। তিনি স্থানীয়ভাবে তরুণ প্রজন্মের কাছে পরিচিত মুখ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, এ আসনে যদি বিএনপি অভ্যন্তরীণ কোন্দল কাটাতে না পারে এবং জামায়াতের ভোটব্যাংক আগের মতোই দৃঢ় থাকে, তাহলে সিলেট-৩ আসনে নির্বাচনী সমীকরণ এবার ভিন্ন চিত্র ধারণ করতে পারে।

নিজস্ব প্রতিবেদক 















