সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এক নারী ইন্টার্ন চিকিৎসকের ওপর হামলার ঘটনায় পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এদিকে হামলার প্রতিবাদে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ডাকা কর্মবিরতি অব্যাহত রয়েছে। প্রশাসনের অনুরোধেও কর্মবিরতি প্রত্যাহার করেননি তারা। ইন্টার্ন চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে তিন দফা দাবি জানানো হয়েছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার রাতে সুনামগঞ্জ থেকে অন্তসত্ত্বা এক নারীকে নিয়ে ওসমানী হাসপাতালে ভর্তি হন তার স্বজনরা। ওই নারীর চিকিৎসা নিয়ে বাগবিতন্ডার জেরে রাত সাড়ে ১১টার দিকে হাসপাতালের চারতলার ৪ নম্বর ওয়ার্ডে এক নারী ইন্টার্ন চিকিৎসকের ওপর হামলা চালান ওই রোগীর স্বজনরা।এ খবর পেয়ে অন্য ইন্টার্ন চিকিৎক ও হাসপাতালের স্টাফরা জড়ো হলে হাসপাতালে ব্যাপক উত্তেজনা দেখা দেয়। এসময় রোগীর স্বজনরা হাসপাতালে ভাঙচুর চালান। পরে পুলিশ ১ নারী ও ২জন পুরুষকে আটক করে। এসময় রোগীর স্বজনদেরও মারধর করা হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে দুজন আহত হয়ে বেসসরকারি হাসপাাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। আটককৃতরা সবাই সুনামগঞ্জের বাসিন্দা বলে পুলিশ জানায়।আটককৃতরা হলো, সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক থানার খৈতর গ্রামের সুরুজ আলীর ছেলে শিমুল আহমদ (৩৫), একই গ্রামের শিমুল আহমদের স্ত্রী নাজিরা সিদ্দিকা (৩২) ও ছাতক থানাধীন দৌলতপুর গ্রামের বাসিন্দা জাবেদ মিয়া (৩০)।এদিকে শুক্রবার রাতেই এক বিবৃতিতে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা জানান, মধ্যরাতে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে কর্তব্যরত একজন নারী শিক্ষানবিশ চিকিৎসকের ওপর ন্যক্কারজনক হামলার ঘটনা ঘটেছে। একটি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে, বিশেষ করে একজন নারী চিকিৎসকের ওপর এ ধরনের হামলা আমাদের জন্য চরম লজ্জাজনক ও উদ্বেগজনক। এই বর্বর হামলার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি ও অবিলম্বে দোষীদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি। সাথে সাথে হাসপাতালগুলোতে ইন্টার্ন ও জুনিয়র চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের কার্যকর ও স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানাই।তারা বলেন, ইন্টার্ন চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আমরা এই হামলার প্রতিবাদে অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পরে শনিবার সকাল থেকে ধর্মঘট শুরু করেন তারা।
এদিকে, হামলার ঘটনা তদন্তে শনিবার দুপুরে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করার কথা জানিয়েছেন হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল উমর রাশেদ মুনির।তিনি জানান, কর্মক্ষেত্রে চিকিৎসকের ওপর হামলার ঘটনা ন্যাক্কারজনক। হাসপাতালের চিকিৎসক ও কর্মীদের নিরাপত্তা আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। ঘটনার পর থেকেই হাসপাতাল ও আশপাশের এলাকায় শান্তি বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তদন্ত কমিটি ঘটনার সব দিক খতিয়ে দেখছে। আশা করছি দ্রুত একটি স্থায়ী সমাধানে পৌঁছানো যাবে।তবে ইন্টার্ন চিকিৎকরা ধর্মঘটে থাকলেও হাসপাতালের সেবা ব্যাহত হচ্ছে না জানিয়ে তিনি বলেন, হাসপাতালের মিড লেভেলের চিকিৎসকসহ সংশ্লিষ্টরা দায়িত্ব পালন করছেন।কর্মবিরতি শুরুর পর শনিবার দুপুর ১২টার দিকে আন্দোলনরত ইন্টার্ন চিকিৎসকদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন হাসপাতালের পরিচালকসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী আলোচনা শেষে কর্মবিরতি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা।বৈঠক শেষে ইন্টার্ন চিকিৎসক মিজানুর রহমান বলেন, আমরা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে কয়েকটি দাবি তুলে ধরেছি। কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাসহ এসব দাবি সমাধান হলে আমরা যে কোনো সময় কাজে ফিরে যেতে প্রস্তুত।আন্দোলনে থাকা ইন্টার্ন চিকিৎসক মার্জিয়া আলম বলেন, ‘দায়িত্বরত চিকিৎসককে সেবা দিতে হলে অনেক কিছু প্রক্রিয়া রয়েছে হাসপাতালের। রোগীরা অনেক ক্ষেত্রেই সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করেন না। আমাদের নারী চিকিৎসককে হেনেস্তার সুষ্ঠু বিচার না হওয়া পর্যন্ত আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাবো।’ওসমানী হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মো. মাহবুবুল আলম বলেন, ‘হামলার ঘটনায় নিরাপত্তা ও দোষীদের শাস্তির দাবিতে শিক্ষানবিশ চিকিৎসকরা রাত থেকেই কর্মবিরতি পালন করছেন। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের অগ্রাধিকার।’
তিনি বলেন, ‘হাসপাতাল এলাকায় শান্তি বজায় রাখতে আমরা প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। আলাদা চিকিৎসক স্কোয়াড গঠন করে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা চলছে। এ ঘটনায় পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়টিও প্রক্রিয়াধীন।’এ ব্যাপারে সিলেট কোতোয়ালি থানার ওসি মাইনুল জাকির বলেন, বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে হাসপাতালে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। হামলার ঘটনার পরপর নারীসহ তিনজনকে আটক করা হয়।অভিযোগ পেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানান ওসি মাইনুল জাকির।সিলেট মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (মিডিয়া) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘রোগীর স্বজনদের সঙ্গে হাসপাতালের শিক্ষানবিশ চিকিৎসক ও স্টাফদের মধ্যে তর্ক এবং মারামারির ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশের কয়েকটি দল হাসপাতালে যায়। হামলার ঘটনায় কয়েকজন আটক আছেন। হাসপাতাল এলাকায় নিরাপত্তা ও শান্তি বজায় রাখতে পুলিশ তৎপর আছে।’হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন ও প্রশিক্ষণ) ডা. মো. কামরুজ্জামান বলেন, ‘হাসপাতালে যে ঘটনা ঘটেছে তা একেবারেই ন্যক্কারজনক। হাসপাতালে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মবিরতিতে রোগীদের সেবার ক্ষেত্রে কোনও সমস্যা হচ্ছে না। রোগীদের সেবা চলমান রয়েছে। হাসপাতালে আমাদের ইনডোর মেডিক্যাল অফিসার, রেজিস্ট্রার, সহকারী রেজিস্ট্রারসহ দায়িত্বরতরা রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।’তবে রোগীদের সেবার ক্ষেত্রে ঘটনার সময় চিকিৎসকের দায়িত্বে গাফিলতি থাকলে তা তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. এস এম আসাদুজ্জামান জুয়েল জানান, ৯শ বেডের ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে প্রতিদিন আড়াই থেকে তিন হাজার রোগী ভর্তি থাকেন। এ কারণে চিকিৎসা সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে তাদের গলদঘর্ম হতে হয়।

নিজস্ব প্রতিবেদক 









