ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে মৌলভীবাজারে তৈরি হয়েছে ব্যতিক্রমী দৃশ্যপট। জেলার ৪টি আসনের মধ্যে ৩ ও ৪ নম্বর আসন সবচেয়ে বেশি আলোচনায়। মৌলভীবাজার-৩ (সদর–রাজনগর) আসনে স্বামী–স্ত্রী একই আসনে মনোনয়ন দাখিল, আর মৌলভীবাজার-৪ (কমলগঞ্জ–শ্রীমঙ্গল) আসনে পিতা–পুত্র স্বতন্ত্র ও দলীয় প্রতীক নিয়ে নির্বাচনযুদ্ধে নামার ঘোষণা—ভোটারদের মধ্যে তৈরি করেছে কৌতূহল ও নানা বিশ্লেষণ।
মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষদিন পর্যন্ত এই আসনে সাতজন প্রার্থী মনোনয়ন জমা দিলেও সবচেয়ে আলোচনায় বিএনপি নেতার স্ত্রীর স্বতন্ত্র মনোনয়ন। বিএনপি মনোনীত এম নাসের রহমান যখন ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে মাঠে, তখন তাঁর স্ত্রী রেজিনা নাসের স্বতন্ত্র হিসেবে মনোনয়ন দাখিল করায় রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন—এ কি ভোট কৌশল, নাকি আসল প্রতিদ্বন্দ্বিতা?
শেরপুর বাজারে চায়ের দোকানের টেবিলে আড্ডায় বাছন নামে এক দোকানি বলেন— “স্বামী–স্ত্রী এক আসনে দাঁড়ানো নতুন অভিজ্ঞতা। এটা কৌশলও হতে পারে—শেষ মুহূর্তে একজন সরে গিয়ে অন্যজনকে শক্তিশালী করার পথ খোলা থাকবে।”
রাজনগরের এক শিক্ষক ভিন্ন মত দেন— “রেজিনা নাসের দীর্ঘদিন সামাজিক কাজ করেন। তিনি স্বামী থেকে আলাদা ভোটও টানতে পারবেন হয়তো। দলীয় রাজনীতির বাইরে ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতার পরীক্ষা বলা যায়।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্বামী–স্ত্রীর প্রার্থিতা ভোটের সমীকরণে বৈচিত্র্য তৈরি করবে। ভোট ভাগাভাগির সম্ভাবনা যেমন আছে, তেমনি স্বতন্ত্র প্রার্থী থাকায় প্রতিপক্ষের ভোটও বিভক্ত হতে পারে।
দলের একজন নেতার মত— “আওয়ামী লীগ অংশ না নেওয়ায় বিএনপি ভিতরেই কৌশলগত স্থানবিন্যাস হতে পারে। আবার জনপ্রিয়তা যাচাই করারও সুযোগ তৈরি হয়েছে।” বাছাই শেষে বৈধতা টিকে থাকলে মাঠে দেখা যাবে—এই দম্পতি কি সত্যি মুখোমুখি লড়বেন, নাকি কৌশল প্রয়োগ করে শেষ সময়ে এক প্রার্থী সরে যাবেন?
অন্যদিকে মৌলভীবাজার-৪ (কমলগঞ্জ–শ্রীমঙ্গল) আসনেও চমক। বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মুজিবুর রহমান চৌধুরী মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। একই আসনে তাঁর ছেলে মুঈদ আশিদ চিশতী স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। স্থানীয় সূত্র মতে, “বাবার মনোনয়ন বাতিল হলে বিকল্প হিসেবে ছেলে থাকবেন।”— এমন ধারণা থেকেই দুই প্রার্থীর নাম তোলা। শ্রীমঙ্গলের এক যুবক তুহিন আহমেদ বলেন, “পিতা–পুত্র একই আসনে দাঁড়ানো নতুন ঘটনা। এটা রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ধরে রাখার কৌশল বলেই মনে হয়।”
আরেক প্রবীণ চা শ্রমিক নেতা নিতাই গৌরের মন্তব্য করেন— “যদি দুজনই টিকে যান তাহলে ভোট বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। তবে শেষ পর্যন্ত সমঝোতার সম্ভাবনাই বেশি।”
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এমন মনোনয়ন নির্বাচনকে আরও আলোচনা ও উত্তেজনা বাড়াবে। পরিবারভিত্তিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন রাজনৈতিক চিত্র তৈরি করতে পারে, আবার কৌশলগতভাবে সরে দাঁড়িয়ে এক প্রার্থীকে এগিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
কারা লড়ছেন এ আসনে: মৌলভীবাজার-৩ এ এম নাসের রহমান (বিএনপি) বনাম রেজিনা নাসের (স্বতন্ত্র) (স্বামী–স্ত্রী) এবং মৌলভীবাজার-৪ এ মুজিবুর রহমান চৌধুরী (বিএনপি) বনাম মুঈদ আশিদ চিশতী (স্বতন্ত্র) (পিতা–পুত্র)।
ভোটারদের মুখে একই প্রশ্ন—এ কি নির্বাচনী স্ট্র্যাটেজি, নাকি প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতা? শেষ পর্যন্ত কে থাকবেন মাঠে, আর কে সরে দাঁড়াবেন?
নির্বাচন কমিশন যাচাই–বাছাই সম্পন্ন করে বৈধ প্রার্থীর তালিকা প্রকাশ করলেই অনেক কিছু স্পষ্ট হবে। তবে নিশ্চিতভাবে বলা যায়—মৌলভীবাজারের নির্বাচন এবার চমক ও আলোচনা থেকে বঞ্চিত হবে না।

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি 



















